Logo
রাষ্ট্র ও নীতি

পালাক্রমে ঈদযাত্রা: আরও নিরাপদ হোক সড়ক 

রড

রাইটার্স ডেস্ক

25/5/2026, 4:17


পালাক্রমে ঈদযাত্রা: আরও নিরাপদ হোক সড়ক 

ছবি: এ আই

নিজস্ব প্রতিবেদক । রাইটার্স


বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতি ঈদেই আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু সেই আনন্দের মহোৎসব বিষাদে রূপ নেয় যখন চিরচেনা ‘সড়ক দুর্ঘটনা’র খবর সংবাদমাধ্যমে শুনতে পাই। একটি দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণের সমাপ্তি নয়, বরং একটি পরিবারের জন্য দুঃসহ স্মৃতি।

প্রতি বছরই ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনার এই বিভীষিকা দেশের মহাসড়কগুলোতে যেন নিয়মিত এক নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ঈদুল ফিতরেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি।

গত ঈদের পরিসংখ্যান: শুধুই লাশের মিছিল

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রার ১৫ দিনে (১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ) দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।

  • মোট দুর্ঘটনা: ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনা।

  • নিহত: ৩৫১ জন মানুষ প্রিয়জনের কাছে ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছেন।

  • আহত: ১,০৪৬ জন ব্যক্তি গুরুতর জখম হয়েছেন, যাদের অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

  • মোটরসাইকেল ট্র্যাজেডি: মোট দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ৩৬.১২% ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, যাতে প্রাণ গেছে ১৩৫ জনের।

কেন প্রতি ঈদেই বাড়ে এই মৃত্যুর মিছিল? (দুর্ঘটনার মূল কারণ)

বিশেষজ্ঞ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সংস্থাগুলোর মতে, ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ দায়ী:

১. ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালক: ঈদের বাড়তি আয়ের লোভে সড়কে নামানো হয় বছরের পর বছর বসে থাকা ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও ট্রাক। অনেক সময় অভিজ্ঞ চালকের অভাবে হেলপার বা লাইসেন্সবিহীন চালকেরাও গাড়ি চালায়।

২. অতিরিক্ত ট্রিপ ও ক্লান্তি: যানজটের কারণে চালকেরা পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ পান না। একটানা গাড়ি চালানোর ফলে ক্লান্ত ও তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

৩. মোটরসাইকেলের বেপরোয়া ব্যবহার: গণপরিবহনের সংকট এড়াতে এবং দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে লাখ লাখ মানুষ মোটরসাইকেলে মহাসড়কে নামেন। গতি ও ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।

৪. বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং: ফাঁকা রাস্তা পেলেই ট্রাফিক আইন অমান্য করে দ্রুত যাওয়ার প্রবণতা এবং যত্রতত্র ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ।

মৃত্যুর মিছিল থামাতে করণীয় ও প্রতিকার:

ঈদযাত্রাকে নিরাপদ এবং উৎসবকে আনন্দময় করতে সরকার, পরিবহন মালিক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিকারের প্রধান উপায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা: ঈদের আগে কোনো অবস্থাতেই যেন লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে নামতে না পারে, সে জন্য বিআরটিএ (BRTA) এবং হাইওয়ে পুলিশকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

  • চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ: দূরপাল্লার রুটে কোনো চালককে একটানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে দেওয়া যাবে না। প্রতিটি বাসে বিকল্প চালক রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

  • মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা: মহাসড়কে মোটরসাইকেলে দূরপাল্লার যাতায়াত এবং একসঙ্গে তিন জন আরোহী ওঠার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে।

  • মহাসড়কের ত্রুটি দূর করা: ব্ল্যাক স্পট (Black Spot) বা মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ বিপজ্জনক মোড়গুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।

  • যাত্রীদের সচেতনতা: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাসের ছাদে বা ট্রাকে যাতায়াত বন্ধ করতে হবে। "সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি"—এই সত্যটি যাত্রী ও চালক উভয়কেই অনুধাবন করতে হবে।

  • পর্যায়ক্রমে ছুটির ব্যবস্থা: ঈদযাত্রায় সবাইকে একসাথে ছুটি না দিয়ে পালাক্রমে ঢাকা ছাড়ার ও প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করা।

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই পরিবারের সাথে মিলিত হওয়া। এই আনন্দ যেন কোনোভাবেই চিরদিনের কান্নায় পরিণত না হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর তদারকি এবং চালক-যাত্রী সবার দায়িত্বশীল আচরণই পারে আগামী ঈদগুলোকে রক্তপাতহীন ও নিরাপদ করতে।

ন/উ


পঠিত: 20 বার