
রাইটার্স ডেস্ক
20/5/2026, 8:43

ছবি: সংগৃহীত
আজকের সমাজে ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতা, নৈতিকতা ও ঈমানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিদ্রোহ। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে নতুন নতুন ধর্ষণের খবর আমাদের হৃদয়কে আহত করে। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউ নিরাপদ নয়। প্রশ্ন হলো, কেন এমন ভয়ংকর অপরাধ বাড়ছে? ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে? এবং এর সমাধান কী?
ধর্ষণ: ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ:
ইসলাম নারীকে সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিয়েছে। কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া তার প্রতি জোরপূর্বক আচরণ করা ইসলামি শরিয়তে মহাপাপ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটি শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়; বরং পুরো সমাজকে কলুষিত করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ ও মন্দ পথ।”
— (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
ইসলাম শুধু ব্যভিচারকে হারাম করেনি, বরং যেসব পথ মানুষকে সেই দিকে নিয়ে যায়, সেগুলোকেও বন্ধ করতে বলেছে।
ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কিছু প্রধান কারণ
১. আল্লাহভীতি ও ঈমানের দুর্বলতা:
যখন মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় কমে যায়, তখন সে গোপনে বা প্রকাশ্যে যেকোনো অপরাধ করতে সাহস পায়। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, তার কাছে পাপ সহজ হয়ে যায়।
২. অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার:
আজ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে খুব সহজেই অশ্লীল কনটেন্ট মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। পর্নোগ্রাফি মানুষের চিন্তা, দৃষ্টি ও চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। ধীরে ধীরে মানুষ বাস্তব জীবনেও বিকৃত আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
৩. দৃষ্টির হেফাজত না করা:
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ চোখ থেকেই অনেক পাপের শুরু।
আল্লাহ বলেন—
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর: ৩০)
৪. পরিবারে ইসলামী শিক্ষার অভাব:
শিশুদের শুধু দুনিয়াবি শিক্ষা দিলেই যথেষ্ট নয়। যদি সন্তান ছোটবেলা থেকেই তাকওয়া, লজ্জাশীলতা ও নারীর সম্মান শেখে না, তাহলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বাড়বে।
৫. অবাধ মেলামেশা ও হারাম সম্পর্ক:
বর্তমানে “ফ্রি মিক্সিং”, অবৈধ সম্পর্ক ও বেহায়াপনা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এগুলো মানুষের লজ্জাবোধ নষ্ট করে দেয়।
৬. আইনের দুর্বল প্রয়োগ:
অপরাধী যখন দেখে সে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন অপরাধ বাড়ে। ন্যায়বিচার দেরিতে হলে বা না হলে সমাজে ভয় কমে যায়।
উত্তরণের পথ: ইসলাম কী শিক্ষা দেয়?
১. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি জাগ্রত করা:
সমাজ পরিবর্তনের শুরু হয় অন্তর থেকে। মানুষকে বুঝাতে হবে—কোনো অপরাধ গোপন নয়; আল্লাহ সব দেখছেন।
২. দৃষ্টি ও চরিত্রের হেফাজত:
ইসলাম শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও শালীনতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়। সমাজে লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
৩. পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতা বন্ধে সচেতনতা:
পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে যেন তরুণরা অশ্লীলতার ভয়াবহতা বুঝতে পারে।
৪. সন্তানদের ইসলামী তরবিয়ত দেওয়া
* ছেলে সন্তানদের শেখাতে হবে—
* নারী কোনো ভোগের বস্তু নয়;
* একজন নারীও কারো মা, বোন বা কন্যা;
* প্রকৃত পুরুষ সে-ই, যে নারীর সম্মান রক্ষা করে।
৫. দ্রুত ও ন্যায়ভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করা:
অপরাধীর প্রতি দয়া দেখানো মানে সমাজের নিরপরাধ মানুষের প্রতি জুলুম করা। কঠোর ও দ্রুত বিচার অপরাধ কমাতে সহায়ক।
৬. সমাজে দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করা:
মসজিদ, পরিবার, স্কুল ও মিডিয়াকে একসাথে নৈতিকতা ও মানবিকতা প্রচারে কাজ করতে হবে।
আমাদের করণীয়:
শুধু সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রত্যেক পরিবারকে নিজের ঘর থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে। একজন বাবা তার ছেলেকে, একজন মা তার সন্তানকে, একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে—নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিন।
কারণ ধর্ষণ শুধু আইনের ব্যর্থতা নয়; এটি ঈমান, চরিত্র ও সমাজব্যবস্থারও সংকট।
উপসংহার:
ইসলাম নারীকে সম্মান দিয়েছে, নিরাপত্তা দিয়েছে এবং সমাজকে পবিত্র রাখার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা মেনে চলি, তাহলে সমাজ থেকে অনেক অপরাধ কমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ আমাদের সমাজকে অশ্লীলতা, জুলুম ও সকল ফিতনা থেকে হেফাজত করুন।
আমীন।
লেখা: শায়খ আইন উদ্দিন আইনী
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রিন্সিপাল
মাদ্রাসায় মোহাম্মাদিয়া দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
ন/উ
পঠিত: 35 বার